ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 11 বার পঠিত

ভারতের গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বুধবারের এ সফরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাণিজ্য, রাশিয়ার তেল আমদানি এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন জামনগর শোধনাগার বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনাকে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
রুবিওর সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি, অনন্ত আম্বানিসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের স্বাগত জানান।
সার্জিও গোর জানান, গত এক বছরে ভারতের মোট এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১০ শতাংশেরও কম থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে রিলায়েন্সের প্রস্তাবিত নতুন তেল শোধনাগার প্রকল্প দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
জামনগর সফরে রুবিও রিলায়েন্সের বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র ভান্তারা এবং নতুন জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রও পরিদর্শন করেন। সেখানে সৌরশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কেন গুরুত্বপূর্ণ জামনগর?
রিলায়েন্সের জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্সে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় দেড় শতাংশের সমান এই পরিমাণ।
১৯৯৯ সালে চালু হওয়া প্রথম শোধনাগারটির সক্ষমতা দৈনিক ৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। ২০০৮ সালে চালু হওয়া দ্বিতীয় শোধনাগারটি মূলত রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়।
শোধনাগারটিতে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা যায়। রিলায়েন্সের দাবি, এখন পর্যন্ত এখানে ২১৬টিরও বেশি ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে ডিজেল, পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহে এই শোধনাগারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ডিজেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে জামনগরের গুরুত্ব বেড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও রিলায়েন্সের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন রুবিও। বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের অনুমান, অক্টোবরে জামনগরে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
রুশ তেল নিয়ে চাপে ভারত
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতায় পরিণত হয়। চীনের পর রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। এ সময় রিলায়েন্সও রুশ তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
২০২২ সালের আগে রিলায়েন্সের ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের মাত্র ৩ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।
রুশ তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে রিলায়েন্সও প্রভাবিত হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি রুশ তেল আমদানি কমালেও ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জামনগরে প্রক্রিয়াজাত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল রুশ উৎসের।
রুবিও বলেছেন, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করছে। তবে একদিনে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন। একই সঙ্গে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে আম্বানির হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে রিলায়েন্স। প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ডলারের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় পাঁচ দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বড় তেল শোধনাগার নির্মিত হবে। ২০২৯ সালের দিকে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
রুবিওর সফরের সময় এই বিনিয়োগও ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, অন্যদিকে নিজেদের জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়।
এদিকে আম্বানির সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্কের বিরোধও আলোচনায় এসেছে। ভারতে স্টারলিংকের কার্যক্রমের অনুমতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার মধ্যে মাস্ক অভিযোগ করেছেন, আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তবে রিলায়েন্স বলেছে, তারা কখনো প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি।
রুবিওর জামনগর সফর তাই শুধু একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার তেল, ভেনেজুয়েলার সরবরাহ, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজার এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে সফরটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ সামনে এনেছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, আল-জাজিরা
Posted ৪:৪৯ পিএম | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।